প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২১, ২০২৬, ৫:২৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ১৫, ২০২৬, ৮:৪৮ এ.এম

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি এবং বাংলাদেশী জনশক্তির অন্যতম শীর্ষ গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে বাংলাদেশসহ নয়টি দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন পর্যটন, কর্ম ও ব্যবসায়িক ভিসায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল একটি কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দালালি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং প্রবাসীদের একাংশের আইনগত অসচেতনতা। রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখতে এবং দেশের লাখ লাখ তরুণের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এই সংকটের অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান ও এর স্থায়ী সমাধান খোঁজা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আরব আমিরাতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের এই থমকে যাওয়ার পেছনে বেশ ক’টি কারণ দৃশ্যমান। (ক) ট্যুরিস্ট ভিসার ভয়াবহ অপব্যবহার: সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত উদার। কিন্তু এই উদারতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ পর্যটক সেজে দুবাইতে পাড়ি জমিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিজিট ভিসা নিয়ে দুবাই গেছেন মূলত কাজ খোঁজার উদ্দেশ্যে। বৈধ ওয়ার্ক ভিসার দীর্ঘসূত্রতা ও খরচ এড়াতে দালালেরা সাধারণ মানুষকে এই আত্মঘাতী পথের যাত্রী করেছে। দুবাই পৌঁছে অনেকেই যখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান ভিসায় রূপান্তর করতে পারেননি, তখন তারা সেখানে অবৈধ হয়ে পড়েছেন। ইমিগ্রেশন আইনের এই ধারাবাহিক লঙ্ঘন আমিরাত সরকারকে কঠোর হতে বাধ্য করেছে। ট্যুরিস্ট ভিসাকে কাজের মাধ্যম বানানো এবং ফ্রি ভিসার নামে মানবপাচারের যে মহোৎসব চলেছিল, তা আমিরাতের অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ডিজিটাল ইমিগ্রেশন সিস্টেমের কাছে ধরা পড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে, বৈধ ও সৎ ব্যবসায়ী বা পেশাজীবীদেরও এখন এই সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞার খেসারত দিতে হচ্ছে।
সাধারণ নিয়মে 'ট্যুরিস্ট ভিসা'য় গিয়ে চাকরি খোঁজা বা কাজ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু বাংলাদেশে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং খরচ এড়াতে দালালরা বৈধ ওয়ার্ক ভিসার পরিবর্তে তিন মাসের ভিজিট ভিসা দিয়ে শ্রমিকদের দুবাই পাঠায়। দুবাই পৌঁছানোর পর নিয়ম ছিল নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ভিজিট ভিসাকে কর্মসংস্থান ভিসায় রূপান্তর করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমিরাত সরকার এই "ভিসা স্ট্যাটাস চেঞ্জ" প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশী কর্মী ভিজিট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশে না ফিরে সেখানে অবৈধভাবে থেকে যান। দুবাইতে অবৈধ হয়ে পড়া এশিয়ান প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা অন্যতম শীর্ষ তালিকায় চলে আসে। আমিরাতের আইন অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতিদিনের জন্য ৫০ দিরহাম (প্রায় ১,৬০০ টাকা) জরিমানা গুনতে হয়। বহু শ্রমিক এই বিপুল জরিমানা দিতে না পেরে "আউট পাস" নিয়ে বা পুরোপুরি আত্মগোপন করে অবৈধ শ্রমিক হিসেবে কম মজুরিতে কাজ করা শুরু করেন।
আইনি পরিভাষায় আমিরাতে 'ফ্রি ভিসা' বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। অথচ একশ্রেণির অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি ও স্থানীয় 'কফিল' (স্পন্সর) মিলে ভুয়া বা নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে কর্মী আমদানির কোটা বিক্রি করেছে। চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে দুবাইয়ে পা ফেলার পর সাধারণ শ্রমিকেরা দেখছেন সেই কোম্পানির কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই। চাকরি না পেয়ে লেবার ক্যাম্পগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন, অবৈধভাবে কম মজুরিতে কাজ করা এবং ক্ষুণ্ণিবৃত্তির তাগিদে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা দেশটির আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। সাধারণ শ্রমিকরা মনে করেন "ফ্রি ভিসা" মানে তারা দুবাই গিয়ে যেকোনো জায়গায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তারা যখন দুবাই নামেন, তখন দেখেন সেই কোম্পানির কোনো অস্তিত্বই নেই। মূল মালিক তাদের কোনো দায়িত্ব নেয় না এবং প্রতি মাসে আইডি নবায়ন বা ইকামার নামে উল্টো শ্রমিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।
(গ) রাজতান্ত্রিক দেশের কঠোর আইন ও প্রবাসীদের অসচেতনতা: বাংলাদেশি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে যেকোনো জাতীয় বা রাজনৈতিক সংকটে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করার একটি প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু আরব আমিরাতের মতো রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক সমাবেশ বা মিছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দুবাই ও শারজাহর রাস্তায় প্রবাসীদের বিক্ষোভ প্রদর্শন আমিরাত প্রশাসনকে বড় ধরণের নিরাপত্তা উদ্বেগে ফেলে দেয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অনুরোধে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান তাদের ক্ষমা করে দিলেও, ইউএই প্রশাসন তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশসহ সুনির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর কঠোর ভিসা স্ক্রিনিং ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
বিগত বছরগুলোতে আমিরাতের বিভিন্ন এয়ারপোর্টে কেবল "সন্দেহজনক পর্যটক" হওয়ার কারণে শত শত বাংলাদেশীকে নামতেই দেওয়া হয়নি এবং একই ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কারণ তাদের কাছে পর্যাপ্ত হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং পকেট মানি (ন্যূনতম ৩,০০০ দিরহাম) ছিল না। চাকরি না পেয়ে এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিক দুবাই বা শারজাহর লেবার ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। ক্ষুণ্নিবৃত্তির তাগিদে অনেকেই স্থানীয় আইন ভেঙে কম বেতনে অবৈধ "ক্যাশ জবে" (যেমন- দিনমজুরি, গাড়ি ধোয়া বা ফেরি করা) জড়িয়ে পড়েন। কাজ না থাকায় কিছু অপরাধ চক্র এদেরকে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা, জালিয়াত চক্র, মাদক বা চুরির মতো অপরাধে প্ররোচিত করে। আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বাংলাদেশী ফ্রি-ভিসার কর্মীদের কারণে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি হচ্ছিল। এই সংকটের কারণে ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে আমিরাত সরকার বাংলাদেশসহ নির্দিষ্ট কিছু দেশের ক্ষেত্রে "জিরো টলারেন্স" নীতি গ্রহণ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশ হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে (যেমন- চুরি, মারামারি, অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা এবং সাইবার অপরাধ) জড়িয়ে পড়ার তথ্য দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরে আসে। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলোর (যেমন: আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া) দিকে তাকালে বোঝা যায়, ইউএই মূলত নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে এই তালিকা তৈরি করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ফেডারেশন, যা সাতটি আমিরাত বা অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত। আবুধাবী, দুবাই, শারজাহ, আজমান, উম্ম আল কুয়াইন, রাস আল খিমা ও ফুজাইরা। রাজধানী হল আবুধাবী এবং সবচেয়ে বড় আমিরাত। দুবাই বিশ্বখ্যাত বাণিজ্য ও পর্যটনের প্রধান কেন্দ্র। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সংযুক্ত আরব আমিরাত এর জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ ।এর মধ্যে প্রায় ৮৫–৯০ শতাংশই প্রবাসী এবং মাত্র ১০–১৫ শতাংশ আমিরাতি নাগরিক। ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম প্রবাসী-নির্ভর দেশ। ফলে বাংলাদেশিরা দেশটির অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বাংলাদেশী প্রবাসীদের সিংহভাগই দুবাই, আবুধাবি এবং শারজাহ—এই তিনটি প্রধান আমিরাতে বসবাস ও কাজ করেন। এছাড়া আজমান, রাস আল খিমা এবং আল আইন শহরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী রয়েছেন।
আমিরাতে থাকা বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রায় ৮৫% থেকে ৯০% মূলত ব্লু-কালার কর্মী (সাধারণ ও দক্ষ শ্রমিক)। তারা প্রধানত নির্মাণ খাত, পরিচ্ছন্নতা ও পৌরসেবা, কৃষি, পরিবহন এবং বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে দুবাই এবং শারজাহতে বাংলাদেশীদের মালিকানাধীন ছোট ও মাঝারি ব্যবসা (যেমন: গ্রোসারি শপ, কার্গো সার্ভিস, রেস্তোরাঁ ও রিয়েল এস্টেট ব্রোকারেজ) বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে নতুন কর্মী বা ভিজিট ভিসার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং কড়াকড়ির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে নতুন করে বাংলাদেশীদের যাওয়ার হার অনেকটাই কমে এসেছে। তবে যারা আগে থেকেই বৈধ ভিসা বা রেসিডেন্সি পারমিট নিয়ে সেখানে আছেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাজ পরিচালনা করছেন।
২০২৬ সালের সর্বশেষ জনমিতি অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতীয় প্রবাসীর মোট সংখ্যা প্রায় ৪৩ লাখ ৯০ হাজার । দেশটির মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৩৭.৯৬% নাগরিকই ভারতীয়। তারা আমিরাতের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান প্রবাসী জনগোষ্ঠী। আমিরাতে কর্মরত মোট ভারতীয়দের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই সরাসরি কর্মজীবী বা শ্রমিক (বাকি অংশ পরিবার বা অন্যান্য নির্ভরশীল সদস্য)। সাম্প্রতিক সময়ে আমিরাত সরকার তাদের শ্রমবাজারের নিয়মকানুন আধুনিকায়ন করায় ভারত থেকে অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মী যাওয়ার হার অনেক বেড়েছে। ভারত সরকারের সর্বশেষ ই-মাইগ্রেট ডাটা অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ভারতীয় ব্লু-কালার শ্রমিকদের সবচেয়ে পছন্দের শীর্ষ গন্তব্য হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সমাধান যেখানে আরব আমিরাতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত ভাল ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে এই ভাল সম্পর্কের সমীকরণটি এখন আর কেবল "সস্তা শ্রম" বা "ভাতৃত্ববোধের" ওপর ভিত্তি করে চলছে না। ইউএই এখন তাদের অর্থনীতিকে জ্ঞানভিত্তিক করতে চায়। এই সংকট চিরস্থায়ী নয়, যদি বাংলাদেশ সঠিক সময়ে সঠিক কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হাত নিতে পারে অচলঅবস্থার অবসান হবে। আমিরাত সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে অনতিবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নিশ্চিত করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কূটনৈতিক টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। তাদের আশ্বস্ত করতে হবে যে, বাংলাদেশী নাগরিকেরা কখনো আমিরাতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে না।
ইউএই বর্তমানে অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিকের চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, এবং প্রকৌশল খাতের মতো দক্ষ পেশাদারদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সিংহভাগ কর্মীই অদক্ষ হওয়ায় বাজার ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। ভিসা জটিলতা নিরসনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে ধরনের উচ্চপর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক চাপ বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা প্রয়োজন, তা সময়মতো বা কার্যকরভাবে সম্পন্ন না হওয়াও এই অচলাবস্থার অন্যতম কারণ।
আরব আমিরাত বর্তমানে তাদের অর্থনীতিকে 'নলেজ-বেজড' বা জ্ঞানভিত্তিক করার লক্ষ্যে অদক্ষ শ্রমিকের কোটা কমিয়ে দিচ্ছে। আমাদেরও প্রথাগত 'ব্লু-কালার' বা অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। আইটি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, স্বাস্থ্যকর্মী, এবং বিভিন্ন কারিগরি খাতে প্রত্যয়িত দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। ভুয়া কোম্পানি ও ফ্রি ভিসার নামে যারা মানবপাচার করছে, সেই লাইসেন্সধারী বা লাইসেন্সবিহীন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এর ডাটাবেজ সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে কোনো কর্মী বৈধ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ছাড়া দেশ ত্যাগ করতে না পারে। দেশ ছাড়ার আগে প্রতিটি কর্মীকে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, সংস্কৃতি, অপরাধের শাস্তি এবং সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে বাধ্যতামূলক ওরিয়েন্টেশন দিতে হবে। "প্রবাসের মাটিতে যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক বা দলীয় কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এর পরিণতি চাকরিচ্যুতি বা কারাদণ্ড" এই বার্তাটি প্রতিটি কর্মীর মগজে গেঁথে দিতে হবে। আরবি ও ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, কর্মসংস্কৃতি এবং সংশ্লিষ্ট পেশার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
উপসংহার
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা হলেও, এটিকে আমাদের জনশক্তি খাতের আমূল সংস্কারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। কেবল আবেগ বা সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে আধুনিক বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। বাংলাদেশ সরকার যদি কঠোরভাবে দালাল চক্র দমন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং দূরদর্শী কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে, তবে খুব দ্রুতই এই অচলাবস্থা কেটে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশ তার গৌরবময় অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের প্রধান শক্তি তার বিপুল জনশক্তি। এই জনশক্তিকে যদি দক্ষতা, শৃঙ্খলা, সততা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত করা যায়, তাহলে শুধু আমিরাত নয়, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা আরও বাড়বে। সমস্যার মূল কারণ জনশক্তির সংখ্যা নয়; বরং দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক আস্থার প্রশ্ন। এই ক্ষেত্রগুলোতে উন্নতি ঘটলে উত্তরণের সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল।
লেখক: সাবেক উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তী সরকার।
drkhalid09@gmail.com